মহাকবি কালিদাস জীবনী | Kalidas Biography in Bengali

Kalidas Biography in Bengali

মহাকবি কালিদাস প্রাচীন ভারতের মহান ও শ্রেষ্ট কবি প্রাচীনকাল থেকেই তাকে ভারতের সাংস্কৃতিক ভাষার সেরা কবির উপাধি দেয়া হয়েছে। তিনি মহারাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের মধ্যে একজন ছিলেন।

তার প্রতিটি রচনা মহাকাব্যিক উপাখ্যান হয়ে রয়েছে ইতিহাস ও সাহিত্য জগতে তার বহুল বিখ্যাত কাব্যটি হচ্ছে মেঘনাদ বধ আরও অনেক লেখার মাধ্যমে তার পান্ডিত্ব প্রশংসিত হয়েছে।

মহাকবি কালিদাস প্রথম জীবনে দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন কিন্তু তার মধ্যে বিদ্যার কোন স্থান ছিলনা তিনি ছিলেন পড়ালেখা না জানা একজন মূর্খ সুদর্শন যুবক।

Kalidas Biography in Bengali
kalidas

মূর্খ কালিদাসের কবি হওয়ার কাহিনী – Kalidas Information in Bengali

কালিদাসের সময়কালে অত্যন্ত সুন্দরী এক রাজকুমারী ছিলেন যার নাম ছিল বিদুৎমা তার সৌন্দর্যের সাথে সাথে সনাতন ধর্মশাস্ত্রেও তার শাস্ত্র জ্ঞানী বিদ্যা ছিল অগাধ তাকে কোনোরকম শাস্ত্র তর্কে হারানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

যুবতী রাজকুমারী বিদ্যুৎমা তার বিবাহের সময়কালে হিন্দু শাস্ত্র বিষয়ক এক প্রশ্ন উত্তর পর্বের আয়োজন করেন সেখানে তিনি মৌন থেকে ইশারার মাধ্যমে প্রশ্ন করার শর্ত রাখলেন তার ইশারার প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদান করি জ্ঞানী বিদ্বানের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব রাখলেন।

বিদুৎমার এই প্রস্তাব প্রচার হতেই বিভিন্ন দূর দূরান্ত রাজ্য থেকে রাজকুমাররা ছুটে আসলেন বিদুৎমার দরবারে তার সাথে শাস্ত্র জ্ঞানের তর্কের আয়োজনে অংশ গ্রহণের জন্য কিন্তু একে একে সকল রাজ্যের রাজকুমারদের নিরাশা নিয়ে ফিরেযেতে হলো।

তারপরে বিদ্বান পন্ডিতদের সুদর্শন ছেলেরা তাদের ধর্ম জ্ঞানের পরীক্ষা দেয়ার ও বিদুৎমাকে বিয়ে করার স্বপ্ন নিয়ে বিদুৎমার রাজ দরবারে হাজির হলো কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তাদের অবস্থা ও রাজকুমারদের মতই হলো পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে তাদের কে একে একে নিজ গৃহে ফিরেযেতে হলো।

তাদের সন্তানদের এই পরাজয়ে পন্ডিতরা বিদুৎমার প্রতি ক্রোধিত হলেন আর এই ছলনা আটতে থাকলেন যে কি করে বিদ্বান রাজকুমারীর বিবাহ কোনো মূর্খের সাথে দেয়াযায় যাতে তাদের সন্তানদের অপমানের উচিত প্রতিশোধ তারা নিতে পারেন।

সেই ভাবনা থেকেই তারা গোপনে একজন মূর্খের সন্ধানে কিছুদিন ঘুরতে লাগলেন একদিন যাত্রাপথে তারা দেখলেন একজন সুদর্শন যুবক একটি গাছের উপরে উঠে যে ডালে তিনি বসেছেন সেই ডালটাই তিনি কেটে চলেছেন পন্ডিতদের আর কোন সন্দেহের অবকাশ রইলোনা তারা যুবকেক এই বলে রাজিকরালেন যে তার বিবাহ একজন সুন্দরী রাজকুমারীর সাথে হতে যাচ্ছে বিনিময়ে তাকে তাদের কথামতো রাজসভায় যেতে হবে ও মৌন থাকতে হবে।

পন্ডিতরা তাদের মতকরে কালিদাসকে সুন্দর বশ্রপরিধান করে বিদ্যুৎমার সভায় হাজির করলেন কালিদাস তখন পন্ডিতদের আদেশানুসারে চুপ রইলেন সুদর্শন কালিদাসকে বিদ্বান পন্ডিতগণ তাদের গুরু বলে শাস্ত্র প্রশ্ন উত্তর সভায় পরিচয় দিলেন ও বললেন আপনার ইশারায় করা প্রশ্নের উত্তর আমাদের জ্ঞানী গুরু ও ইশারার মাধ্যমেই দেবেন কালিদাসের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য্য দেখে বিদ্যুৎমার মনে কোনো রকমের সন্দেহের সৃষ্টি হয়নি তিনি অত্যন্ত খুশি মনেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।

কালিদাস ও বিদুৎমার প্রশ্ন উত্তর পর্ব

শাস্ত্র তর্কের প্রথম প্রশ্নে রাজকুমারী কালিদাসকে এক আঙ্গুল দেখান মূর্খ কালিদার মনে করেন বিদুৎমা তার এক চোখ তুলে ফেলতে বলছেন উত্তরে কালিদাস তুমি আমার এক চোখ তুলেদিলে আমি তোমার দুই চোখ তুলেদেব ভেবে দুই অঙ্গুল দেখান।

আর বিদ্বান পন্ডিতগনরা এই ইশারার ব্যাখ্যা করেন রাজকুমারী আপনি বলেছে এই সমস্ত সৃষ্টি একই ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি কিন্তু আমাদের জ্ঞানী গুরুজী বলছেন এই সৃষ্টির রহস্যে রয়েছে ঈশ্বর আর তার শক্তি প্রকৃতি অর্থাৎ পুরুষ আর প্রকৃতি দুজনে মিলেই সৃষ্টির আরাম্ভ।

কালিদাসের ইশারার উত্তরের পন্ডিতদের বিশ্লেষণে বিদুৎমা সন্তুষ্ট হন এবং তাদের মতামত সঠিক মনেকরে মেনে নেন।

পরবর্তী প্রশ্নের ইশারায় বিদুৎমা পাঁচ অঙ্গুল দেখান মূর্খ কালিদাস মনেকরেন রাজকুমারী তাকে থাপ্পড় দেখালেন কালিদাস ঘুসি দেখালেন এই ভেবে যে আপনি আমাকে থাপ্পড় পারলে আমি আপনাকে ঘুষি মারবো।

তখন উপস্থিত পন্ডিতগণ এর এই অর্থ বের করলেন যে আপনি বলেছেন পাঁচ ইন্দ্রিয় থেকেই মানুষের সৃষ্টি আমাদের গুরু বললেন এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের শিকল ভাঙতে পারলেই ঈশ্বরকে পাওয়া যায়।

তারপরে রাজকুমারী সাত অঙ্গুল দেখান তার উত্তরে পন্ডিতের আসনে বসা মূর্খ কালিদাস তাকে নয় আঙ্গুল দেখালেন।

নয় আঙ্গুল দেখানোর উত্তরে পন্ডিতরা বোঝালেন আপনি পাঁচ জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের সাথে মন আর বুদ্ধি একত্রিত করে সাত সংখ্যা দেখালেন আর আমার গুরু তার সাথে চিত্ত ও অহংকারকে তার সাথে জুড়ে দিলেন। এই উত্তরে বিদুৎমা কিছুটা আশ্চর্যিত ও প্রসন্ন হলেন যে তার সামনে যে বসে রয়েছে সে আসলেই পরম জ্ঞানী।

এই ভাবে রাজকুমারী বিদুৎমার সাথে মূর্খ কালিদাসের ইশারায় প্রশ্ন ও ইশারায় উত্তর পর্ব চলতে লাগলো কালিদাসের উত্তরের ইশারার বিশ্লেষণ জ্ঞানী ও বিদ্বান পন্ডিতেরা তাদের মতকরে বিদুৎমাকে বোঝাতে লাগলেন ধীরে ধীরে সভায় উপস্থিত জনতার জয়োধ্বনি উঠলো মূর্খ কালিদাসকে নিয়ে আর জনমতের উৎসাহে ও প্রশ্নের বিশ্লেষণে বিদুৎমা তার পরাজয় স্বীকার করলেন।

সুন্দরী বিদুৎমা পরাজয় মেনে নেয়ার সাথে সাথে কালিদাসকে তার সাথে বিবাহে সম্মতি দিলেন। মূর্খ কালিদাসের সাথে শাস্ত্রে বিদ্বান কালিদাসের বিবাহের আয়োজন সম্পন্ন হলো। কালিদাস বিদুৎমার সাথে রাজপ্রাসাদে থাকতে লাগলেন।

কালিদাসকে বিদুৎমার তিরস্কার ও পরিত্যাগ

রাজপ্রাসাদে একদিন রাজকুমারী বিদুৎমা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই একটি উট দেখতে পান উটের পিঠে একটি সাংস্কৃতিক ভাষায় লেখার বিশ্লেষণ তিনি কালিদাসকে জিজ্ঞাসা করেন কালিদাস তার উত্তর না জানার ও সাংস্কৃত বিদ্যার অপারগতার কথা প্রকাশ পেয়েযায় আর তাতেই বিদুৎমার কাছে সব কিছু পরিষ্কার হয়েযায় পন্ডিতদের চালাকির কাছে তার পরাজয়ের অনুশোচনায় তিনি কালিদাসকে তিরস্কার করেন।

শুধু তিরস্কারেই বিদুৎমার রাগ প্রশমিত হয়নি তিনি কালিদাসকে পরিত্যাগ করেন এই বলেযে শাস্ত্র জ্ঞানহীন মূর্খের সাথে তার একসাথে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। তার পাশাপাশি তিনি কালিদাসকে বলেন যাও আর তখনি ফিরে আসবে যখন বিদ্বান হতে পারবে।

তার সহধর্মিনীর এই তিরস্কারে কালিদাসের মনে নিজের মূর্খতার প্রতি অপমান অনুভব করেন আর তার স্ত্রীর কথায় জিজেকে কঠিন সংকল্পে আবদ্ধ করেন আর বিদ্যান হয়েই উপস্থিত হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেই প্রাসাদ পরিত্যাগ করেন।

কালিদাসের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ

মহাকবি কালিদাস তার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার রচিত কাজের কারণে তাকে বিশ্বের সেরা কবি ও নাট্যকারদের মধ্যে গণ্য করা হয়।

তাঁর রচনায় সাহিত্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর রচনার একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে, তবে কালিদাস তাঁর বিশেষ 7টি রচনার কারণে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক খ্যাতি পেয়েছেন, সেগুলি নিম্নরূপ –

  • মহাকাব্য- রঘুবংশ, কুমারসম্ভব।
  • খন্ডকাব্য- মেঘদূত, ঋতুসংহার।
  • তিনটি নাটক বিখ্যাত-
  • বিক্রমোর্বশিয়া
  • অভিজ্ঞান শকুন্তলম
  • মালবিকাগ্নিমিত্র।

কালিদাস পন্ডিতের উক্তি – Kalidas Bani

মহাকবি Kalidas কালিদাসের মতানুসারে মানুষের অধপতনের বা ধংসের ছয়টি লক্ষণ হল ১. নিদ্রা ২. রাগ ৩. ভয় ৪. তন্দ্রা ৫. অলস ও ৬. কাজকে দেরি করার প্রবণতা।

কালিদাসের জন্মস্থান কোথায় ?

কালিদাসের জন্মস্থান প্রাচীন ভারতের কোথায় হয়েছিল এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনো সঠিক ভাবে পাওয়া যায়নি কারণ কালিদাসের জন্মস্থান সম্পর্কে কোন প্রামানিক ইতিহাস এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি তার পূর্বপুরুষ দের সম্পর্কে ও তেমন কিছু জানা যায়নি।

কবি কালিদাস সম্পর্কে বিভিন্ন অন্ন কবি ও রাজাদের ভূয়সী প্রশংসা ইতিহাসে পাওয়া গেলেও তার সম্পর্কে সেই সময়ে কোন কবিই বিস্তারিত ভাবে কিছু লিখেন নি হয়তোবা অনেক লেখা কালের গভীরে হারিয়ে গিয়েছে সংরক্ষণের অভাবে।

কবি কালিদাস তার কাব্য মেঘদূত এ উজ্জয়িনী র মাহত্ম বর্ণনা করেছেন আর এই করণেই অনেক ইতিহাসকারী কালিদাসের জন্মস্থান মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী বলে মনে করেন।

তবে অনেকে পন্ডিত তার জন্মস্থান উত্তর ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যে কবিলথা গ্রামে হয়েছিল বলে প্রমান করতে চেয়েছেন। উত্তরাখন্ড রাজ্যের রুদ্রপ্রয়াগ ডিস্ট্রিক্ট এ কবিলথা গ্রামে তার একটি মূর্তি ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে সেখানকার রাজ্য সরকারের অর্থায়নে।

Read More

Swami Vivekananda Biography in Bengali

Leave a Comment